Logo Design Logo Design Logo Design

।।।বৃষ্টির শব্দ।।।

3 minutes


মোহাস্মদ জাহিদ হোসেন
*****************

জীবন আসলে মানুষকে অনেক রূপ দেখায়। জীবন কথনো দুরন্ত আবার কখনো শান্ত। আর জীবনের সাথেই থাকে অভাব আর অনটনের এক নিবিড় সম্পর্ক। অভাব কখনো কখনো এমন ভাবে জীবন চলার পথে অন্তরালের সৃষ্টি করে যার জন্য মানুষকে বেঁচে থেকেও প্রতিনিয়ত মুত্যুর স্বাদ নিতে হয়। লেখকের আজকের লেখা জীবনের বাস্তব কাহিনী অবল্বনে ………………..

নিম্নচাপের প্রভাব পড়েছে সারা দেশ। অঝোড়ে ঝড়ছে বৃষ্টি। চারিদিকে কেবলি বৃষ্টির রিনিঝিনি শব্দ।
আমি আনমনে শুয়ে শুয়ে বৃষ্টির অপূর্ব শব্দের সুর শুনি । হার্টের রিং এর গোড়ায় ব্লক নিয়েও আজ সারাদিন প্রচণ্ড পরিশ্রম করেছি।
চাকুরীটা যাবার পর থেকেই আমার হার্টের ব্যথাটা আরো বেড়ে গেছে।
আমি কেমন যেন অন্যরকম হয়ে গেছি। এখনও সকালে ঘুম থেকে উঠে, গোসল করে নাস্তা করতে করতে হঠাৎ মনে পড়ে যায়” চাকুরীটা তো আর নেই।”
আমার উপর দিয়ে বয়ে গেছে এক প্রবল ঝড়, যা আমার জীবনটাকে লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে। সর্বোচ্চ ডিগ্রি থাকা সত্ত্বেও আজও কোন চাকুরী পায়নি আমি।

  • Save

লেখকঃ মোহাস্মদ জাহিদ হোসেন


কিন্তু তাই বলে তো আর আমার সংসারের চাকা থেমে নেই।
বড় মেয়েটা অনেক কষ্ট করে এবার এইচ.এস.সি ২য় বর্ষে উঠেছে সমানেই তার ফরম পূরণের সময়, বাকী রয়েছে ৬ মাসের বেতন। কিন্তু আমার সীমাহীন দারিদ্র্তা আর অসুস্থতার কারণে মেয়েকে আর পড়াতে পারছি না । তবুও শেষ চেষ্টা করেছি মেয়েটার পড়াকে সচল রাখার জন্য।
আজও আমার বড় মেয়েটা সকাল বেলা উঠে কলেজে যাবার জন্য প্রস্তুতি নেয়। কিন্তু যখন বুঝতে পারে তার তো আর কলেজ নেই। বড় মেয়ের চোখ দুটো লাল হয়ে যায়, চোখের কোনায় জমে থাকা শিশির বিন্দু যেন কেবল ঝড়ে পড়ার অপেক্ষায়। আমি আর সহ্য করতে পারছি না। আমার বুকের ভীতরটা ভেঙে চুরমার হয়ে যায়।
আবার চাকুরীটা না থাকার কারণে আমার বাড়ী ভাড়া বকেয়ে হয়ে গেছে। বাড়ীওয়ালার অকথ্য বকা তো আছেই। তার উপর উনি আবার হাতে ধরিয়ে দিয়েছেন বাসা ছাড়ার নোটিশ ।


সব কিছু মিলিয়ে আমার বুকের ব্যথাটাকে আরো বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু অসুস্হ হতে পারি না, অসুস্হ
হয়ে পড়ে থাকলে তো আর সংসার চলবে না।সংসারের চাকা সচল রাখতে আজ আমার কলমের হাতে  ধরেছি রিক্সার হাতল। কাল রাতে হাতের তালুগুলি বেশ ফুলে উঠছে,পায়ের পেশীগুলো টন টন করে ব্যথা করছে। রাতে ঘুমাতে যাবার সময় মনে হয় সমস্ত ব্যাথা আমার শরীরটাকে নীল করে তুলেছে। পরের দিন খুব সকালে সেই ব্যাথা নিয়েই আবার বের হতে হয়। ফোসকা পড়া হাতেই আবার ধরতে হয় রিক্সার হাতল। এভাবে চলছে আজ বেশ কিছু দিন।
বৃষ্টির প্রবলতা আস্তে আস্তে বাড়ছে।


আমার ছোট মেয়ে পরী। পরী এখন সব কিছু বুঝলেও ওর মধ্যের ছেলেমানুষীকতাটা এখনো পরিণত হয়নি। রাতে হঠাৎ টের পেলাম আমার মাথায় একটা শীতল পরশ। তাকাতেই দেখলাম পরীর হাসি মাখা মুখ। পরী বেশ আবেগভরা কন্ঠে আমার কাছে আবদার করল, আব্বু অনেক দিন পোলাও আর গরুর মাংস খাইনা, কাল আমাকে একটু এনে দিবে?”
পরীর কথায় আমার রাতের শান্ত নির্জন পৃথিবীটা কেঁপে উঠলো, মনে হলো শান্ত সাগরে হঠাৎ ঢেউ এলো। কারণ সারাদিন যা পাওয়া যায় তা দিয়ে কোন রকম মোটা চালের ভাত আর আলু ভর্তা জোটে,  সেখানে এই খাবার ?
পরীর হাসি মাখা মুখটাতে কোন ভাবেই অন্ধকার দেখতে ইচ্ছা করছিলো না। আমি বেশ শান্ত স্বরে পরীকে বললাম,
“ঠিক আছে মামণি,কাল তোমাকে এনে দিবো।”
প্রচণ্ড বৃষ্টি আর মেঘের গর্জন শুনতে শুনতে কখন যে আমার চোখটা বন্ধ হয়ে গেল তা আমি নিজেও টের পায় নি। পরের দিন শুক্রবার ফজরের আযানের সময় যখন আমার ঘুম ভাঙ্গলো তখনো বিরামহীন বৃষ্টি।


বৃষ্টি মাথায় নিয়েই গ্যারেজে যাই। গ্যারেজ থেকে রিক্সা বের করে চালাতে থাকি প্রায় মাজা সমান পানির মধ্যদিয়ে আমার সমস্ত শরীরটা ভিজে যায় বৃষ্টির পানিকে ছাপিয়ে আমার শরীরের ঘামে।
প্রায় আধা ঘন্টা ভেজার পরে আমার প্রথম যাত্রী আমার রিক্সায় উঠালো। কোমর সমান পানির মধ্যে দিয়ে ছুটে চলেছে আমার রিক্সা। আজ আমার প্রচণ্ড কষ্ট হচ্ছে, ভেজা শরীর দিয়েও আমার ঘাম বয়ে চলেছে বৃষ্টির ধারার সাথে।
শরীরটা বার বার স্তব্ধ হতে চাইছে কিন্তু আজ আমার থামার এতটুকু সময় নেই। আজ যে পরীর জন্য বাজার করতে হবে। তার পর একের পর এক যাত্রী টেনে চলেছি আমি ।


বিকেলের দিকে রিক্সাটা গ্যারেজে জমা দিয়ে পরির জন্য সমস্ত বাজার শেষ করে, বাসায় যাই।
আমার সমস্ত শরীর কাঁপছে থর থর করে। মনে হয় বৃষ্টিতে ভিজে আমার হার্টের ব্যথা আরো দ্বিগুন হচ্ছে।
আস্তে আস্তে দিনের আলো ফুরিয়ে যাচ্ছে, যেমন করে একটু একটু করে আমি শেষ হয়ে যাচ্ছি সংসারে যাতাকলে পড়ে। রাতে হালকা আলোতে পরী খেতে বসেছে। আমি তার পাশে বসে আছি আর দেখছি পরীর মুখের অসাধারণ তৃপ্তিকর হাসি।
আস্তে আস্তে কেমন যেন পরীর সেই হাসিটা আমার চোখে ঝাপসা হতে লাগলো। হঠাৎ আমার সমস্ত চেতনা উবে যেতে লাগলো আর বিড় বিড় করে বলতে লাগলাম
“বাবারা কখনো দুর্বল হয় না,বাবারা কখনো দরিদ্র হয় না,বাবারা কখনো হারে না, বাবারা কখনো হার মানতে শিখেনি।”
তার পর স্তব্ধ সব, আমার চেতনা ছিলো না ছিলো, শুধু আমার চোখে প্রবল বৃষ্টিতে পরীর হাসি মাখা মুখ। আর কানে বাজছিলো বৃষ্টির শব্দ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Translate »
Share via
Copy link
Powered by Social Snap