“ দুর্গতনাশিনী মা দুর্গা”

2 minutes
  • Save
মা দুর্গা প্রতীমা

শ্রী উত্তম কুমারঃ

হাজার হাজার বছর ধরে বিশ্বব্যাপী জাঁকজমকের সাথে পালন করা হয় শারদীয় দুর্গাপূজা বা দুর্গা উৎসব। কে এই দুর্গা, কি তাঁর পরিচয়, কিবা তার ইতিহাস? এটা অনেকেই যেমন যানেন। তেমন লক্ষ লক্ষ মানুষের কৌতূহলেরও অন্ত নেই। বিশ্ব পূজা উৎযাপন পরিষদের নেতা হিসেবে অসংখ্য মানুষের ভিতর এ কৌতুল দেখেছি। সেই কৌতূহল নিবারণের জন্যই আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস।

পুরান মতে দুর্গা পৌরাণিক দেবী। তিনি আদ্যাশক্তি, মহামায়া, শিবানী, ভবানী, দশভুজা, সিংহবাহনা ইত্যাদি নামে অভিহিত হন। দুর্গা বা দুর্গম নামক দৈত্যকে বধ করায় তাঁর নাম দুর্গা। আবার জীবের দুর্গতি নাশ করেন বলে তাঁকে বলা হয় দুর্গতিনাশিনী দুর্গা।

উপ-মহাদেশের অন্যতম প্রাচীন ধম’র মধ্যে অন্যতম প্রধান বৃহৎ ধর্ম সনাতন ধর্ম। এ ধর্মের রয়েছে অসংখ্য দেব-দেবী ও অসংখ্য পীঠস্তান বা পবিত্রভূমি।

ধর্মে বর্ণিত আছে যে অতি প্রাচীন কালে অসীম শক্তি নিয়ে জগৎজুড়ে বিচরণ করতো মহিষাসুর নামক এক ভয়ানক দানব। যাকে বধ করা কোনো পুরুষের পক্ষে কখনো সম্ভব ছিলোনা। যাকে বর দিয়েছিলেন স্বয়ং ব্রহ্মা। তাই অমিত ক্ষমতাশালী এই মহিষাসুরকে বধ (হত্যা) করার জন্যই তৎকালীণ সময়ের প্রেক্ষাপটে ধরাতে অধিষ্ঠিত হন স্বয়ং “মা দুর্গা”। ঐ সময় ব্রহ্মার বরে পুরুষের অবধ্য মহিষাসুর নামে ঐ দানব স্বর্গরাজ্য পুরোটা দখল করে নেয়। ফলে রাজ্যহারা দেবতারা কোনো উপায় না পেয়ে বিষ্ণুর শরণাপন্ন হন। বিষ্ণুর নির্দেশে তখন সব দেবতার তেজঃপুঞ্জ থেকেই মূলতঃ মা দুর্গার জন্ম হয়।

  • Save

সকলেই জ্ঞাত আছেন যে, এক পর্যায়ে দেবতাদের শক্তিতে শক্তিময়ী এবং বিভিন্ন অস্ত্রে সজ্জিতা হয়ে মা দুর্গা এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে মহিষাসুরকে বধ করে লেখেন এক অনন্যা ইতিহাস। সে বিশ্বাস ও অফুরন্ত ভক্তি শ্রদ্ধা থেকেই হাজার হাজার বছর ধরে পালিত হচ্ছে দুর্গাপূজা বা শারদিয় দুর্গোৎসব।

সন্মূখ সমরে অদম্য শক্তিশালী মহিষাসুরকে বধ করার পর তেকেই মা দুর্গার আরেক নাম হয়  মহিষমর্দিনী বা মহিষাসুরকে বধকারিনী । পুরাণমতে, মা দুর্গা মহাদেব বা শিবের স্ত্রী। তাঁর গায়ের রং অতসী ফুলের মতো সোনালি হলুদ। তিনি দশভুজা ও ত্রিনয়নী। তাঁর বাহন সিংহ। দেবীপুরাণ, দেবী ভাগবত, কালিকাপূরাণ, দুর্গোৎসববিবেক, দুর্গোৎসবতত্ত্ব প্রভূতি গ্রন্থে দুর্গা সম্পর্কে বিস্তারিত ও পুঙ্খানুপুঙ্খ ব্যাখ্যা বা বর্ণনা রয়েছে।

আদি পুরাণে উল্ল্যেখ করা হয়েছে যে, পুরাকালে রাজ্যহারা রাজা সুরথ এবং স্বজনপ্রতারিত বৈশ্য সমাধি মেধস্ মুনির আশ্রমে উপস্থিত হলে তাঁর পরামর্শে উভয়েই দেবী দুর্গা বা ভগবতীর পূজা করেন। পূজায় তুষ্ট হয়ে তাদের মনস্কামনা পূর্ণ করেন।

এছাড়া কৃত্তিবাসী রামায়ণ মতানুসারে রামচন্দ্র রাবণবধের জন্য অকালে শরৎকালে দেবী দুর্গার পূজা করেছিলেন বলে এর নাম হয় অকালবোধন বা শারদীয় দুর্গাপূজা। অবশ্য লঙ্কারাজ রাবণ চৈত্র মাসে দুর্গাপূজা করতেন বলে একাধিক ধর্মীয় গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে ।

তবে আমরা যে বাসন্তী পূজা দেখি বা মানি সেটা দুর্গা পূজারই রূপান্তর বা অন্য রূপ। মূলতঃ বসন্তকালে দূর্গাপুজা হলে তাকেই বলা হয় বাসন্তী পূজা।

অবশ্য বাংলাদেশ ও প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে পশ্চিমবঙ্গসহ বাঙালিরা সাধারণতঃ শরৎকালেই মা দুর্গার উৎসব ও পূজা অর্চনা করে থাকেন।

আর বাসন্তী পূজা হয় চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষে। অবশ্য শারদীয় দুর্গাপূজা হয় আশ্বিন বা কার্তিকের শুক্লপক্ষে।আর এ কারণেই শুক্লা ষষ্ঠী তিথিতে দেবীর বোধন হয়। যেটাকে আমরা সোজাসাপ্টা ভাষায় বলি পূজা পটে উঠা। এরপর সপ্তমী অষ্টমী ও মহা নবমীর দিন জাঁকজমকভাবে পূজা অর্চনা শেষে দশমীতে দেয়া হয় প্রতীমা বিসর্জন।

ভারতের বিভিন্ন স্থানে দুর্গাপূজার প্রচলন আছে।

কাশ্মির ও দাক্ষিণাত্যে এ পূজার নাম “ অম্বা বা অম্বিকা “ গুজরাটে “ হিঙ্গুলা ও রুদ্রানী” মিথিলায় “ উমা “ এবং কাণ্যকুঞ্জে “ কল্যাণী ” নামে দুর্গাপূজার উৎসব ও পূজা অর্চনা করা হয়।

মহানবমীর দিনই মূলতঃ মূল উৎসবটি হয়ে থাকে । এ দিন সনাতন ধর্মালম্বিরা সাধ্যমতো নতুন পোষাক পরিধান করেন। এছাড়া আলিঙ্গন, প্রণাম, আশীর্বাদ ইত্যাদির মাধ্যমে তারা একে অপরের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।

দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে অনেকস্থানে দশোহরার মেলার প্রচলনও দেখা যায়।অনেকে আবার নৌকা বাইচের আয়োজনও করে থাকেন।

দুর্গাপূজার এ পাঁচ দিন শারদীয় উৎসব প্রত্যক্ষ করতে অন্যান্য ধর্মের মানুষও যোগ দেন। এতে অন্যান্য ধর্মালম্বীদের সাথেও সনাতন ধর্মালম্বীদে সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি বা ভাতৃত্ববোধ অনেকাংশে বৃদ্ধি পায়।

  • Save
উত্তম কুমার

লেখকঃ শ্রী উত্তম কুমার

অন্যতম শীর্ষ নেতা, পূজা উৎযাপন পরিষদ

শিক্ষানুরাগী ও সমাজ সেবক

দর্শনা, চুয়াডাঙ্গা-৭২০০

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Translate »
Share via
Copy link
Powered by Social Snap