বাঘায় প্রকৌশলীকে মারপিট,সংবাদ প্রকাশের পর সাংবাদিকদের প্রাণনাশের হুমকি

4 minutes
  • Save
আওয়ামী লীগের হাইব্রীড ও স্বঘোষিত কা্উয়া নেতা কুদ্দুস

বাঘা প্রতিনিধি, রাজশাহীঃ

রাজশাহীর বাঘায় উপসহকারী প্রকৌশলীকে মারপিট’র সংবাদ প্রকাশের পর দৈনিক কালের কণ্ঠ ও ইত্তেফাক পত্রিকার বাঘা প্রতিনিধিকে প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছে আওয়ামীলীগ নেতা আব্দুল কুদ্দুস সরকার। এ ঘটনায় শুক্রবার রাতে বাঘা উপজেলা সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে।

স্থানীয় একাধিক সূত্রে জানা গেছে, একাধিকবার দল পরিবর্তন করা নেতা আব্দুল কুদ্দুস সরকার প্রথমে জাতীয় পার্টি, এরপর বিএনপি, পরে আওয়ামী লীগে এসে ক্ষমতার দাপটে অস্থির করে তুলেছেন এলাকাবাসীকে। তার নানা কর্মকাণ্ডে বিব্রত খোদ উপজেলা আওয়ামী লীগ।

পুলিশ সুত্রে জানা যায়, তার নামে ধর্ষণ ও বিবস্ত্র মামলা থেকে শুরু করে সাংবাদিক ও পুলিশকে হুমকি এবং তার ছেলে কর্তৃক সরকারি দুই কর্মকর্তাকে মারপিটসহ এলাকায় ককটেল ফাটিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করার ঘটনায় বাঘা থানায় একাধিক জিডি ও মামলা রয়েছে।

জানা গেছে, গত ১৯ জানুয়ারি নিম্নমানের ইট দিয়ে রাস্তার কাজ করতে বারণ করায় উপ-সহকারী প্রকৌশলী ফরিদ আহাম্মেদকে অফিসে এসে মারপিট করে তার বড় ছেলে সেলিম সরকার। এর আগে সেলিম বাঘা পৌর সভার হিসাব রক্ষক হাচান আলীকেও মারপিট করেন। আর এ খবর বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকায় প্রকাশ হলে দৈনিক কালের কণ্ঠইত্তেফাক পত্রিকার সাংবাদিক যথাক্রমে লালন উদ্দিন ও নুরুজ্জামানকে মোবাইলে হুমকি দেন আব্দুল কুদ্দুস।

অভিযোগ রয়েছে, ১৯৯৮ সালে বাঘা থানায় দায়েরকৃত বহুল আলোচিত নারী বিবস্ত্র মামলা ও ২০১৭ সালে জমি রেজিস্ট্রির ঘটনায় ককটেল ফাটিয়ে এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি করেন একাধিকবার দল পরিবর্তন করা নেতা আব্দুল কুদ্দুস। তিনি ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সপ্তায় এক রূপসী নারীকে ধর্ষণের পর আলামত নষ্টের জন্য ডাক্তারকে প্রতারণা পূর্বক ৫০ হাজার টাকা উৎকোচ প্রদানের চেষ্টার অপরাধে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ওসিসিতে র‌্যাবের হাতে আটক হন।

এ সময় তার নামে পৃথক দুটি মামলা দায়ের করা হয়। বিতর্কিত এ ব্যক্তি ২০০৭ সালে একটি প্রতারণা মামলায় তদবির করে নির্বাচিত মেয়র আক্কাছ আলীকে যৌথ বাহিনীর হাতে আটকের পর ভারপ্রাপ্ত মেয়রের দায়িত্ব পান। এরপর শুরু হয় তার দুর্নীতি ও অর্থ বাণিজ্য। ভারপ্রাপ্ত মেয়র হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণের পর ২০০৮ সালে তার বিরুদ্ধে টেন্ডারবাজি, চন্ডিপুর পশুহাটের ইজারায় দুর্নীতিসহ নানা অপকর্মের অভিযোগে পৌর সভার ৯ জন কমিশনার ওই বছরের মে মাসে ভারপ্রাপ্ত মেয়র আব্দুল কুদ্দুসের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব উত্থাপন করেন।

এরপর ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি জাতীয় নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে ভোট যুদ্ধে নেমে আলোচনায় আসেন তিনি। এদিকে এতকিছুর পরও রাজনৈতিক মার প্যাচে ২০১৪ সালে পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন তিনি। এরপর থেকে তিনি আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। অর্থের প্রতি তিনি এতোটায় আসক্ত যে, সিএনজি (পরিবহন) না থেকেও ২০১৬ সালে জোরপূর্বক তিন (সিএনজি) মালিক ইউনিয়নের সভাপতি হন। এরপর নতুন করে শুরু হয় টোল আদায়ের নামে পরিবহন থেকে চাঁদাবাজি। বাঘা দলিল লেখক সমিতির সাবেক সভাপতি স্বপন সরকার ও সাধারণ সম্পাদক মমিন হোসেন জানান, ২০১৭ সালের ১৬ জানুয়ারি কুদ্দুস সরকার তার সহযোগী আব্দুল আজিজ নামের এক ব্যক্তির জন্য বাঘা দলিল লেখক অফিসে এসে সমিতিকে টাকা না দিয়ে দলিল লিখতে বলেন। এরপর বিনা টাকায় জমি লিখতে না চাইলে দলিল লেখককে মারপিট এমনকি ককটেল ফাটিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করেন। এতে করে সরকারি এক (নারী) কর্মকর্তাসহ দু’জন পুলিশ সদস্য আহতও হন। তার এ

আচরণে খোদ উপজেলা নির্বাহী অফিসার পুলিশ নিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। পরে তার বাসা তল্লাশি চালানো হয়। তল্লাশিকালে বিপুল পরিমাণ লাঠি-সোটা উদ্ধার করে পুলিশ।তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, ২০১৩ সালে তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুস সোবানকে ম্যানেজ করে চরাঞ্চলে বন্যার্থদের ৫ টন চালের অর্ধেক সরিয়ে মুড়ি সরবরাহ করাসহ সরকারি বরাদ্দের অংশ হিসেবে টিয়ার-কাবিখা এবং খাদ্য গোডাউনে সিন্ডিকেট করে গম সরবরাহের।

এ ঘটনা নিয়ে পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ হলে নির্বাহী কর্মকর্তাকে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়। এর আগে ওই নির্বাহী কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে স্থায়ী ব্যবসা না থাকার পরেও বাঘা ও মনিগ্রাম হাটের সরকারি জায়গায় পৃথক দুটি দোকান ঘর বরাদ্দ পান আব্দুল কুদ্দুস সরকার।তার বিরুদ্ধে ১ জানুয়ারি মাঝপাড়া বাউসা এলাকায় একটি রাস্তা নির্মাণ করতে গিয়ে রাস্তার দুই পাশের সরকারি দেড় শতাধিক গাছ উপড়ে ফেলার অভিযোগে পরদিন থানায় মামলা করেন উপজেলা বন বিভাগের এক কর্মকর্তা।

এর আগে ২৯ ডিসেম্বর ২০১৯ বাঘা লাকী সিনেমাহলের সামনে পৌর মেয়রের নিষেধ উপক্ষো করে নিম্নমানের খোয়া ব্যবহার করে একটি রাস্তা নির্মাণ করেন তিনি। লোকজনের অভিযোগ, আব্দুল কুদ্দুস সরকার একজন ঠিকাদার হিসাবে যেখানেই উন্নয়নমূলক কাজ করুক না কেন প্রতিটা কাজে তার অনিয়ম দুর্নীতি রয়েছে। আর এ সব দুর্নীতির কারণে তিনি আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনেছেন।

বাঘা পৌর মেয়র ও আ’লীগ নেতা আক্কাছ আলী জানান, উপজেলার মিলিক বাঘা গ্রামের মরহুম খলিল সরকারের বড় ছেলে কুদ্দুস সরকার সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসাইন মুহাম্মদ এরশাদ এর শাসনামলে জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়ে ডিও লেটার কেনা বেচার মাধ্যমে শূন্যে থেকে বিপুল ধণ সম্পদের মালিক হন।

এর আগে তিনি বিএনপির রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। পরে ২০০৬ সালের ২৯ মার্চ পৌর সভার নির্বাচনে ৬নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর হওয়ার পর তিনি আ’লীগে আসেন।

বর্তমানে কাউন্সিলর না থাকলেও সকল ক্ষেত্রে দলীয় প্রভাব খাটান তিনি।একই কথা বলেন, বাঘা থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল ইসলাম বাবুল, আড়ানী পৌর মেয়র মুক্তার আলী, বাঘা পৌর আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক মামুন হোসেন, বাঘা পৌর কাউন্সিলর শাহিনুর রহমান পিন্টু ও বাঘা থানা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মোকাদ্দেস।বাঘা থানা অফিসার ইনচার্জ (ওসি) নজরুল ইসলাম জানান, নারী বিবস্ত্র ও ধর্ষণ মামলাসহ বিভিন্ন অভিযোগে আব্দুল কুদ্দুস সরকারের নামে বেশ কয়েকটি মামলা এবং একাধিক জিডি রয়েছে।

সম্প্রতি বাউসা এলাকায় ভেকু দিয়ে রাস্তার গাছ উপড়ে ফেলার বিষয়ে তার নামে একটি মামলা এবং বাঘা প্রেস কাবের সাধারণ সম্পাদক নুরুজ্জামান ও অর্থ সম্পাদক লালন উদ্দিনকে হুমকি দেওয়ায় তার নামে জিডি করা হয়েছে।

এ ছাড়াও উপ-সহকারী প্রকৌশলীকে মারপিট করার অভিযোগে তার বড় ছেলের নামে পৃথক একটি মামলা রেকর্ড করা হয়েছে। এরপর থেকে পলাতক রয়েছেন তার ছেলে সেলিম সরকার

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আব্দুল কুদ্দুস সরকার বলেন, ছেলের সাথে প্রকৌশলীর ঘটনাটি অনাকাঙ্ক্ষিত। তিনি সাংবাদিককে হুমকি দেওয়ার ঘটনা সঠিক নয় বলেও দাবি করেন।এছাড়াও বলেন, রাজনীতি করার কারণে প্রতিপক্ষরা আমার নামে নানা কথা বলতে পারে।এ নবিষয়ে স্থানীয় সূধি মহল ডিবি, ডিএসবি, এনএসআই, ডিজিএফ সহ প্রশাসনের গোপন ইনভেস্টিগেশন সাপেক্ষে হাইব্রীড নেতা কুদ্দুস ও তার ছেলে সেলিম সরকার এর কঠিন থেকে কঠিনতর শাস্তি নিশ্চিত করার জোর দাবী জানিয়েছেন।

Translate »
Share via
Copy link
Powered by Social Snap