সাবধানতা এবং সামাজিক সচেতনতাই পারে ধর্ষণ প্রতিরোধ করতে

3 minutes
  • Save

বিশেষ প্রতিবেদন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মোঃ কাইফ ইসলামঃ

সম্প্রতি রাজধানীর কুর্মীটোলা এলাকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী ধর্ষনের ঘটনা ব্যাপক আলোচিত হচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শিক্ষক সবাই নারী নিপীড়ন ও ধর্ষকের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবীতে আন্দোলনরত,উত্তাল প্রায় দেশের অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
নারীর ওপর নির্যাতন, পীড়ন, যৌন হয়রানি ও হত্যার ঘটনা দিন দিন বাড়ছে। শুধুমাত্র ধর্ষনের ঘটনা ২০১৮ থেকে ২০১৯ এ কয়েকগুন বেড়েছে। এসব অপরাধ সংঘটনের কারণ সামাজিক অবক্ষয়, সমাজ ও রাষ্ট্রের নজরদারির অভাব এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির অধঃপতন। পাশাপাশি রয়েছে প্রশাসন ও পুলিশের দায় এড়ানোর মনোভাব ও দুর্নীতি, অপরাধীদের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া, বিচারের দীর্ঘসূত্রতা, বিচারে প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপ এবং সুশিক্ষা ও সচেতনতার ঘাটতি। রাষ্ট্র কঠোর হলে, বিচার যথাযথ হলে এবং সমাজ ও পরিবার নৈতিক অবস্থানে দৃঢ় থাকলে এমন অপরাধ অনেকাংশে কমে যাবে বলে বিশ্বাস করি।

এবার ধর্ষন নিয়ে কিছু আলোচনা করতে চাই।
ধর্ষণ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। বিষয়টা একদিক থেকে ইতিবাচক। কেউ বলছেন পুরুষ মাত্রই ধর্ষক আবার কেউ একটু সংশোধন করে বলছেন সকল পুরুষ মস্তিষ্কে ধর্ষক। অনেকেই আবার বলছেন সকল পুরুষ ধর্ষক নয়। কিন্তু পুরুষমাত্রই ধর্ষক অথবা সম্ভাব্য ধর্ষক কে হতে পারে বা ধর্ষণ করতে এলে তাকে কি করা উচিৎ সেটা নিয়ে আলোচনা যতটা জরুরী তার থেকে বেশী জরুরী ধর্ষণ কি করে প্রতিরোধ করা যায়। অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য এই বিষয়ে তেমন কোনো লেখা বা কার্যক্রম আজ অবধি পরিলক্ষিত হয় নাই।

ধর্ষনের এই চলমান ধারাকে ইংরেজিতে বলে রেপ কালচার। রেপ কালচারের বাংলা করলে অর্থের ভিন্নতা প্রকাশ পায় বলে ইংরেজি শব্দটাই ব্যবহার করলাম। মেয়েরা কোথাও নিরাপদ নয়। কি ঘরে কি বাইরে। বাড়ির উঠোনে খেলতে থাকা বাচ্চা মেয়েকে তুলে নিয়ে যেমন ধর্ষণ করা হচ্ছে তেমনি চলমান বাসেও মেয়েদের ধর্ষণ করা হচ্ছে। পিপার স্প্রে কিংবা ব্লেড কোনোটাই কার্যকরী ভূমিকা পালন করবে না যতদিন মানসিকতার পরিবর্তন হচ্ছে। বাড়ির উঠোনে খেলতে থাকা বাচ্চাটা না রাখবে ব্লেড না রাখবে পিপার স্প্রে। চলন্ত বাসে ৩/৪ জন পুরুষের কাছে একজন নারীর শক্তি হার মেনে যেতেই পারে। তবে ধর্ষণ বা রেপ কালচার প্রতিরোধের উপায় কি??

কঠিন সত্যটা হচ্ছে ধর্ষণ প্রতিরোধের কার্যকরী ব্যবস্থা এখন পর্যন্ত আমাদের দেশ তো দুরের কথা উন্নত বিশ্বের অনেক দেশেই নেয়া হয় নাই। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে এই বিষয়টা বরাবরই উপেক্ষিত। তবে কিছু কিছু পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে আমরা ধর্ষণ প্রতিরোধে সক্ষম হতে পারি। যেমনঃ

রাষ্ট্র কর্তৃক দ্রুত বিচারের ব্যবস্থা করতে হবে। দেশে আইন থাকলেও প্রয়োগ নাই। যথাযথ সেল গঠনের মাধ্যমে খুব দ্রুত বিচার কার্য সম্পন্ন করা হলে এই ঘৃণ্যতম অপরাধ দমনে সফলতা আসবেই।

পুরুষতান্ত্রিক মনোভাবের পরিবর্তন আনা এক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের কারণে অনেক পুরুষেরাই মনে করে থাকেন তাদের অবস্থান নারীদের উপরে। সে কারণে যৌনাকাঙ্ক্ষা হলে নারীদের ইচ্ছা বা অনিচ্ছার গুরুত্ব অনেকেই দেন না। কিন্তু মনে রাখা বাঞ্ছনীয় যৌনাচারের ক্ষেত্রে উভয়ের ইচ্ছাই সমান গুরুত্বপূর্ণ। পুরুষতন্ত্রের ধারণা এবং প্রয়োগের কারণে নিজেদের সেরা ভাবার মানসিকতা থেকে পুরুষদের বের হতে হবে। প্রাকৃতিকভাবে কোনো পুরুষই ধর্ষক নয়। মনে রাখতে হবে, অনেক পুরুষ এবং ছেলে শিশুও ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। সংখ্যায় বেশি না হলেও হচ্ছে।

ধর্ষণ বিষয়ে সন্তানদের অবহিত করা। বিশেষত ছোট ছেলেদের এই বিষয়ে সম্যক ধারণা দিতে হবে। তাদের বোঝাতে হবে এটা ঘৃণ্যতম অপরাধ। বিদ্যালয়ে নৈতিক শিক্ষা হিসেবে এটি অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।

ধর্ষণ বিরোধী প্রচারণা। ধর্ষণের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রচারণা চালাতে হবে। এতে করে মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে পরিবর্তন সম্ভব।

নারীদের আত্মোন্নতিবিধান নিশ্চিত করতে হবে। ছোটোবেলা থেকেই মেয়েদের শেখানো হয় তার সৌন্দর্যই আসল। এবং ছেলেদের শেখানো হয় নারীদের সৌন্দর্যই তাকে পরিমাপের মানদন্ড। সে কারণে দিনদিন বাহ্যিক সৌন্দর্য সচেতন নারীরা নিজেদের বস্তু বানিয়ে ফেলছে। সৌন্দর্যের তুলনায় ব্যক্তিত্ব অধিক গুরুত্ব বহন করে।নারীদেহ কোন বস্তু নয়। যখন নারীদেহকে বস্তু মনে করা হয় তখন সেখানে বিভিন্ন ধরণের সহিংসতা বৃদ্ধির সম্ভাবনা থাকে।

মিডিয়া এবং যোগাযোগ মাধ্যম কর্তৃক ব্যবস্থা গ্রহণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। টেলিভিশন, রেডিও এবং সংবাদপত্রে ধর্ষণবিরোধী প্রচারণা প্রায় নেই বললেই চলে। কিন্তু এর ভূমিকা অপরিসীম। নাটক, সিনেমাসহ বিভিন্ন ধরণের অনুষ্ঠানে ধর্ষণদৃশ্য বর্জনীয়। বিভিন্ন বিজ্ঞাপণে নারীদের পণ্য হিসেবে ব্যবহারের যে রেওয়াজ চালু রয়েছে সেগুলো শুধু নারী অবমাননাই নয় নারীদেরকে বস্তু ভাবতে সহায়ক। প্রযোজক এবং পরিচালকেরা এখানে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারেন। বিভিন্ন যোগাযোগ মাধ্যম ও মোবাইলফোনে ম্যাসেজের মাধ্যমে প্রচারণা চালানো যেতে পারে।

নীরব দর্শক হয়ে থাকা চলবে না। আমাদের আশেপাশে প্রতিনিয়ত মেয়েদের সাথে নানা ধরণের অনৈতিক কার্যকলাপ চলছে। যারা পাবলিক ট্রান্সপোর্টে যাতায়াত করেন তারা এগুলোর সম্মুখীন বেশি হন। এমন কিছু দেখলে সাথে সাথে প্রতিবাদ করতে হবে। একা ভয় পেলে পাশের জনকে বলতে হবে। প্রতিবাদের ভাষা কঠিন হতে হবে। যারা অপরাধী তারা ভীতু প্রকৃতির হয়।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং কর্মস্থলে ধর্ষিতদের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। কেননা, বহু ক্ষেত্রে দেখা গেছে ধর্ষিতার স্কুল বন্ধ করে দেয়া হতে পারে এই ভয়ে দিনের পর দিন ধর্ষিত হচ্ছে। কর্মক্ষেত্রেও চাকুরী হারানোর ভয়ে বহু নারী ধর্ষণের শিকার হয়েও মুখ বুজে থাকে। সবচেয়ে বড় বিষয় লোকলজ্জার ভয়। প্রতিষ্ঠান কর্তৃক যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে তারা প্রকাশ্যে ধর্ষকের নাম বলতে পারবে। এতে ধর্ষণ কমার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে।

যে সমস্ত সংস্থা ধর্ষিতাদের সহায়তা এবং ধর্ষকদের আইনের আওতায় আনার জন্য কাজ করে তাদের সহযোগিতা এবং সমর্থন দিতে হবে। সরকারী এবং বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় এগুলো করা যেতে পারে। তাতে করে ধর্ষিতা যেমন সহযোগীতা পাবে ধর্ষকের হারও কমে যাবে।

গ্রামে-গঞ্জে ধর্ষণের ঘটনা ঘটলে প্রভাবশালীরা একসাথে বসে পয়সা-কড়ি দিয়ে বা ধর্ষকের সাথে বিয়ে দিয়ে তা মিটিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে থাকে। বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে নির্যাতিতা এক্ষেত্রে কেবল মৌখিক আশ্বাস ছাড়া আর কিছুই পান না। আইন-আদালতকে পাশ কাটিয়ে এধরনের মিটমাটের চেষ্টাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসাবে চিহ্নিত করতে হবে।

এরকম আরো উপায় থাকতে পারে যার মাধ্যমে ধর্ষণ প্রতিরোধ সম্ভব।আমাদেরন সকলের সাবধানতা এবং সচেতনতাই পারে ধর্ষণ প্রতিরোধ করতে।

Translate »
Share via
Copy link
Powered by Social Snap