তরুণী উদ্যোক্তা থেকে জায়না হাবিব বিশিষ্ট ব্যবসায়ী হয়ে ওঠার গল্প

0
227

জুবায়ের, স্টাফ রিপোর্টার:

মিস সৈয়দা জায়না বিনতে হাবিব যিনি জায়না হাবিব হিসেবেও পরিচিত তিনি ১৬ বছর বয়স পর্যন্ত বাবা-মা, ছোট বোন ও নানীর সাথে বাংলাদেশে বসবাস করতেন। ছোটবেলা থেকেই তার শিল্পিসুলভ রুচিবোধের প্রকাশ ঘটেছিল এবং খুব অল্প বয়সেই তিনি তার গানের প্রতিভা এবং রান্নার পারদর্শিতার জন্য সর্বজন পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন। তিনি সবসময় তার ছোট বোনের সাথে সময় কাটাতে পছন্দ করতেন, বেশিরভাগ সময় তিনি ছোটবোনের সাথে কম্পিউটারে গেম খেলে বা তার ছবি তুলে সময় কাটাতেন কারণ তিনি ছবি তুলতে পছন্দ করতেন এবং গেম খেলার প্রতি আসক্ত ছিলেন।

১৬ বছর বয়স পর্যন্ত বেশ স্বচ্ছন্দেই মিস জায়নার জীবন কাটছিল। উচ্চতর শিক্ষালাভের জন্য ৯ম শ্রেণিতে পড়াকালীন তিনি যুক্তরাজ্যের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমান। ইংল্যান্ডে আসার পরপরই ছোট্ট একটি রান্নার কোর্স করার জন্য তিনি ব্রুকল্যান্ড কলেজে ভর্তি হন এবং জিসিএসই ও এ লেভেল সম্পন্ন করার জন্য ওকিং সিক্সথ ফর্ম কলেজে ভর্তি হন।


মিস জায়না একজন মেধাবী ছাত্রী ছিলেন। ইংরেজী সাহিত্য, দর্শন, ব্যবসায়িক শিক্ষা এবং তথ্য ও প্রযুক্তির ব্যাপারে তিনি সর্বদা অনুরাগী ছিলেন এবং এগুলোতে তিনি সম্মাননা অর্জন করেছিলেন। এরপর তিনি লন্ডনের টোকেনহামে অবস্থিত সেন্ট মেরি ইউনিভার্সিটি থেকে ইংরেজিতে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন এবং ২০১৭ সালে ইউনিভার্সিটি অফ লন্ডনের রয়্যাল হলোওয়ে থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিদ্যায় মাস্টার্স ডিগ্রি সম্পন্ন করেন।
বাংলাদেশের জন্য কাজ করার লক্ষ্যে মিস জায়না ২০১৮ সালের শেষের দিকে দেশে ফিরে আসেন। ২০১৯ সালের শুরুর দিকে তিনি তার নানীকে হারান এবং এর পরপরই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন যে তাকে নিয়ে নানী যে স্বপ্নগুলো দেখতেন সেগুলো সব তিনি পূরণ করবেন।

আর এই কারণে দুরারোগ্য ব্যধিতে আক্রান্ত রোগীদের সেবা সহায়তার জন্য অর্থ তহবিল সংগ্রহে তিনি স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করেছেন এবং গত বছর মারাত্মক মহামারীর সময় মিস জায়না তার জীবনের একটি চরমতম লক্ষ্য নির্ধারণ করেন।



নারী, পুরুষ ও ট্রান্সজেন্ডার সম্প্রদায় নির্বিশেষে তাদের উদ্যোগ, প্রতিভা ও দক্ষতাকে কাজে লাগানোর জন্য তিনি ফ্লেক্সবিজ নামে একটি প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলেন। প্ল্যাটফর্মটিকে সবাই যখন সাদরে গ্রহণ করল, তখন তিনি এতে বেশকিছু সুযোগ-সুবিধা যোগ করলেন যেমন পেশাদার আইনজীবী, চিকিৎসক, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, উপদেষ্টা ও ঝুঁকি নিরূপণকারীদের কাছ থেকে অনলাইনে বিনামূল্যে আইনি সহায়তা, দিনরাত ২৪ ঘন্টা টেলিবার্তার মাধ্যমে ঔষধ সেবা,টেলিবার্তার মাধ্যমে কাউনসেলিং সুবিধা, ব্যবসা এবং এর সংশ্লিষ্ট ঝুঁকি বিষয়ে পরামর্শ পাবার সুযোগ রয়েছে।



লকডাউন শেষ হওয়ার সাথে সাথেই তার টিমের সহায়তায় তিনি ফ্লেক্সবিজের মাধ্যমে ডাইভার্সিটি ক্যামপেইনের আয়োজন করেন এবং এর মাধ্যমে বাংলাদেশের ব্যবসা অঙ্গনে প্রথমবারের মত ইনক্লুসিভ মার্কেটিংকে একটি কৌশল হিসেবে প্রবর্তন করা হয় কারণ এই ক্যামপেইনটি লিঙ্গ সমতা, গায়ের রং ও শরীর সম্পর্কে ইতিবাচক চিন্তা-চেতনা এবং অনেকগুলোকে ব্র্যান্ডকে একসাথে কাজ করার বিষয়টিকে তুলে ধরেছে। এর পাশাপাশি তিনি তিন মাসের একটি পেইড ইন্টার্নশিপ করেন এবং সেখানে একজন মার্কেটিং কো-অর্ডিনেটর হিসেবে কাজ করেন ও বর্তমানে চলমান ক্লাউড কিচেন মডেল সম্পর্কে একটি ধারণা লাভ করেন এবং ফুড টেক ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ শুরু করেন।

ফ্লেক্সবিজের দায়িত্ব সামলানোর পাশাপাশি তিনি আরো অনেক প্রোজেক্টে কাজ করেছেন যেগুলো পরবর্তীতে একটি মার্কেটিং এজেন্সী ও একটি প্রোডাকশন প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে এবং বাংলাদেশে প্রথমবারের মত জেন্ডার ডাইভারস ব্রাইডাল ক্যামপেইনের আয়োজন করা হয় যেখানে একজন ট্রান্সজেন্ডারকে বধূ বেশে উপস্থাপন করা হয়। বিভিন্ন ব্র্যান্ডের অনুমোদনের মাধ্যমে এভাবেই প্রতিনিয়ত চলতে থাকা অনিয়মের দেয়াল ভেঙ্গে দেওয়া ও গৎবাঁধা প্রথাকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেওয়ার জন্য প্রতি মাসে নতুন নতুন কন্টেন্ট তৈরি করা হচ্ছে।
সম্প্রতি মিস জায়না ফ্লেক্সবিজের মাধ্যমে নারীদের জন্য অনলাইন ভিত্তিক ফাউন্ডেশন এইডের শুভ উদ্বোধন করেছেন যেখানে পেশাদার ডাক্তার, মনরোগ বিশেষজ্ঞ ও পিসিওএস প্রশিক্ষকরা সেবা প্রদান করবেন। যেসকল মহিলারা মাসিকের সমস্যা ও পিসিওএস এ ভুগছেন তাদেরকে চিকিৎসা সেবা, মানসিক ও পুষ্টিচাহিদার ব্যাপারে দিকনির্দেশনা দেওয়া হবে। এছাড়াও সুবিধাবঞ্চিত নারীদের জন্য চিকিৎসা খরচের ক্ষেত্রে বিশেষ ছাড়ের সুবিধা ও প্রয়োজনবোধে বিনামূল্যে আইনি পরামর্শ পাবার সুযোগও থাকছে এই প্ল্যাটফর্মে।

তদুপরি, এই সকল প্রচেষ্টার মাধ্যমে মিস জায়না এমন একটি সমাজ ব্যবস্থার আশা রাখেন যে সমাজের প্রান্তিক গোষ্ঠী এবং সর্বোচ্চ যে সকল সুযোগ-সুবিধা রয়েছে এর মধ্যে বিদ্যমান দেয়ালটা আর থাকবে না।

তার অতি সাম্প্রতিক উদ্যোগ ব্লিং অ্যান্ড কো ডিভাইন জুয়েলারী, সূক্ষ্ম কাট এবং নৈপুণ্যের সংক্ষিপ্ত সংগ্রহ, সূক্ষ্ম নকশা এবং কমনীয়তার প্রতীক উপস্থাপন করে এই উদ্যোগটি তার ওয়ার্কহোলিক প্রকৃতিরও প্রতিনিধিত্ব করছে; যেহেতু তিনি এখন পপ-আপ খুচরা ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের অন্বেষণও শুরু করেছেন। মিস জায়না মতে, ‘এটি বর্ধন ও বিকাশের দিকে আরও একটি পদক্ষেপ, আমি কাজ করতে পছন্দ করি, আমি কাজের প্রতি সাফল্য লাভ করি, তাই আমি এই সত্যটি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগগুলি অন্বেষণ করেই থাকব যে কোনও লিঙ্গ এবং ক্ষমতাবান ব্যক্তিই নির্ভীক এবং স্ব-স্ব হতে পারে -যখন নিজস্ব কিছু নিয়ে কাজ করার কথা আসে তবে পর্যাপ্ত। ‘




মিস জায়না একসাথে একাধিক প্রকল্পের সমন্বয় করেছেন, যা এই বছরের শুরুর দিকে, একটি সফল বছর দীর্ঘ মেয়াদ শেষ হওয়ার পরে, একটি বিপণন সংস্থা এবং একটি উত্পাদন প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠেছে ফ্লেক্সবিজ সবচেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বাংলাদেশের প্রথম জেন্ডার বৈচিত্র্যময় দাম্পত্য সিরিজ তৈরি করেছে, যার মধ্যে প্লাস-সাইজ এবং অন্ধকার বর্ণের মধ্যে একটি হিজড়া কনের বৈশিষ্ট্য রয়েছে। সুতরাং, প্রতি মাসে গ্লাস-সিলিংগুলি ছিন্নভিন্ন করার এবং প্রচলিত রীতিনীতিগুলিকে বৈচিত্রময় ব্র্যান্ডের অনুমোদনের মাধ্যমে সামগ্রীগুলি সংগ্রহ করা। অতি সম্প্রতি, ফ্লেক্সবিজ বাংলাদেশ শিল্প মহল একাডেমির সহযোগিতায় বাংলাদেশ আর্ট নেশন দ্বারা আয়োজিত বাংলাদেশ পোস্ট মহামারীতে দুর্দান্ত আর্ট প্রদর্শনী (ক্যানভাস ২.০, ২০২১) জন্য পুরষ্কার সংস্থা (প্রাইজ স্পনসর) হিসাবেও কাজ করেছে এবং তাই এটি স্বীকার করা যায় যে ফ্লেক্সবিজ এখন পর্যন্ত তার পুরো যাত্রা জুড়ে কেবলমাত্র বৃদ্ধি এবং টেকসইতা প্রত্যক্ষ করেছে এবং তার সর্বশেষ উদ্যোগ, ব্লিং অ্যান্ড কো, তার বহু-কার্যকরী জীবনযাত্রার একটি সংযোজন।

এখন জাইনা এবাং মাশরুর করিম একত্রে এই ব্যাবসা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে৷ মাশরুর করিম একজন শিল্পী, প্রফেশনাল মার্শাল আর্টিস্ট এবং বক্সার ৷ সে চায় জয়নার সাথে ব্লিং এন্ড কো. কে বাংলাদেশের মদ্ধে হাই ফ্যাশন হিসেবে তুলে ধরতে উভয় নারী ও পুরষের জন্য। তারা তাদের এই লক্ষ্য নিয়ে দিন রাত একসাথে কাজ করে এগিয়ে জাচ্ছে ৷